ছেলের মৃত্যুতে শোকগ্রস্ত খালেদা জিয়াকে ইনজেকশন দিয়ে ঘুম পাড়িয়ে রাখার বক্তব্যে সন্দেহ প্রকাশ করেছেন ওই সময়ে খালেদার কার্যালয়ে অবস্থান করা ব্যারিস্টার রফিক-উল হক।
প্রবীণ এই আইনজীবী বলেছেন, খালেদাকে ঘুম পাড়িয়ে রাখার যে দাবি করা হয়েছে তা তার কাছে সত্য মনে হয়নি।
রোববার সন্ধ্যায় তিনি বলেন, “প্রধানমন্ত্রী যখন সেখানে গেলেন তখন তাকে বলা হলো শোকে মুহ্যমান খালেদা জিয়া এখন দেখা করতে পারবেন না। তাকে ইনজেকশন দিয়ে ঘুম পাড়িয়ে রাখা হয়েছে। আমি সেখানে ছিলাম। আমার কাছে এটি সত্য মনে হয়নি। বাট এনিওয়ে তাকে এ কথা বলা হয়েছে।”
বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেল একাত্তরের কাছেও প্রায় একই মন্তব্য দেন ব্যারিস্টার রফিক-উল হক।
শনিবার বিএনপি চেয়ারপারসনের ছোট ছেলে আরাফাত রহমান কোকোর মৃত্যুর পর খালেদা জিয়াকে সান্ত্বনা জানাতে রাত সাড়ে ৮টায় তার গুলশানের কার্যালয়ে গিয়েছিলেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।
শেখ হাসিনা গিয়ে খালেদা জিয়ার কার্যালয়ের ফটক বন্ধ থাকায় বাইরেই কিছুক্ষণ অপেক্ষা করেন, কিন্তু তার সঙ্গে দেখাও করতে আসেননি বিএনপির কোনো নেতা। ভেতরে ঢুকতে না পেরে ফিরে আসেন প্রধানমন্ত্রী।
প্রধানমন্ত্রী গণভবন থেকে রওনা হওয়ার পর বিএনপি চেয়ারপারসনের বিশেষ সহকারী শামসুর রহমান শিমুল বিশ্বাস সাংবাদিকদের জানান, খালেদা জিয়া অসুস্থ হয়ে পড়ায় তাকে তখন ইনজেকশন দিয়ে ঘুম পাড়িয়ে রাখা হয়েছিল। তিনি প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে দেখা করার অবস্থায় নেই।
ব্যারিস্টার রফিক বলেন, “প্রধানমন্ত্রী দেখা করতে গেছেন। এক মা আরেক মা কে সান্ত্বনা দিতে গেছেন। যদি তিনি অসুস্থ হন তাহলেও তো দুজনই মা। কোন ছেলে তো সেখানে যায়নি। এক মা শুয়ে থাকলে আরেক মা তো তার মাথায় হাত বুলাতে পারতেন।”
তিনি বলেন, “কিন্তু তাকে (হাসিনা) ঢুকতেই দেওয়া হলো না। এটা ভালো হয়নি, খুব খারাপ হয়েছে।”
দেশের প্রবীণ এই আইনজ্ঞ এক সপ্তাহ আগে দেশের সংবাদমাধ্যমকে বলেছিলেন, “দেশে এখন যে পরিস্থিতি চলছে, তা থেকে বের হওয়ার একমাত্র উপায় সংলাপ। দুই নেত্রীর মধ্যে আলোচনার কোনো বিকল্প নেই, সংলাপেই সমঝোতার একটি উপায় বের হবে।”
সেই সংলাপে শনিবারের ঘটনা কোন প্রভাব ফেলবে কিনা, এমন প্রশ্নের জবাবে সবার আস্থাভাজন ব্যারিস্টার হক বলেন, “অবশ্যই প্রভাব পড়বে। আশা করেছিলাম এ সুযোগে সংলাপ হবে। কিন্তু আসলে সেটা হলো না। তবে এখনো আশাবাদী একদিন না একদিন সংলাপ হবেই।”
এদিকে ইত্তেফাকের সাথে আজ অপর এক আলাপচারিতায় ব্যারিস্টার রফিক-উল হক বলেন, “প্রধানমন্ত্রীকে এভাবে ফিরে যেতে হলো, এটা খুবই দুঃখজনক। যে ঘটনা ঘটলো তা প্রধানমন্ত্রীর জন্য প্লাস-প্লাস-প্লাস পয়েন্ট। আওয়ামী লীগ সম্পর্কেও জনমনে ধারণা আরও ভালো হলো। প্রধানমন্ত্রী যে সত্যিকারের একজন মা, একজন বোন-খালেদা জিয়াকে সমবেদনা জানাতে গিয়ে তিনি তা প্রমাণ করলেন। এখন আমি বলবো-সংলাপ হবে না, কিসের সংলাপ! লাত্থি মারি সংলাপের। যে ভদ্রমহিলা প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে এই ধরনের আচরণ করতে পারলেন, তার সঙ্গে কিসের সংলাপ?”
অপরদিকে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ব্যারিস্টার মওদুদ আহমেদও রবিবার রাতে বলেছেন, খালেদা জিয়াকে সমবেদনা জানাতে যাওয়া প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে যথোপযুক্ত সৌজন্য না দেখানো সঠিক হয়নি।
বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা মহাসচিব ডা. বদরুদ্দোজা চৌধুরীও এ ঘটনার সমালোচনা করে বলেছেন, প্রধানমন্ত্রীকে ফিরিয়ে দেওয়া খালেদা জিয়ার কার্যালয়ে তালা দিয়ে তাকে বেরোতে না দেওয়ার ‘সমান অপরাধ’।
এতদিন ধরে সংলাপের কথা বলে আসা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক সৈয়দ আনোয়ার হোসেন শনিবার তাত্ক্ষণিক এক প্রতিক্রিয়ায় বলেন, “প্রধানমন্ত্রীকে এভাবে দরজা থেকে ফিরিয়ে দেয়া শিষ্টাচার বহির্ভূত। দু্ই নেত্রীর মুখোমুখি হওয়ার যে একটা সুযোগ ছিল-আমরা তা হারালাম। নৈকট্যের একটা রসায়ন থাকে। কোকোর মৃত্যুর উছিলায় দুই নেত্রীর সাক্ষাত হলে ভবিষ্যতে আমরা এর ভালো ফলাফল পেতাম। কিন্তু সেই সুযোগ আর হলো না।”
তিনি আরও বলেন, “সৌজন্যতাবোধ থেকে একজন শোকাভিভূত মা খালেদা জিয়াকে সান্ত্বনা জানাতে গিয়েছিলেন শেখ হাসিনা। তিনি যদি অসুস্থ থাকেন, তাহলে অন্তত সেখানে উপস্থিত থাকা বিএনপির নেতারাও বাইরে এসে প্রধানমন্ত্রীকে ভেতরে নিয়ে কথা বলতে পারতেন। কিন্তু সেই ভদ্রতাটুকুও তারা দেখালেন না।”